কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একটি ছবি মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সেই ছবিটি সত্য নাকি এআই দিয়ে তৈরিÑ তা বোঝা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় ডিপফেক শনাক্ত করার প্রযুক্তি এখন শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, বরং তথ্যের সত্যতা রক্ষার অন্যতম প্রধান অস্ত্র।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটরের একটি ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে তাকে হাসপাতালের শয্যায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিভিন্ন চিকিৎসা-যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত দেখা যায়। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আগে থেকেই নানা গুঞ্জন থাকায় ছবিটি দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পায় এবং হাজার হাজার মানুষ সেটি শেয়ার করতে শুরু করেন।
তবে পরে বিষয়টি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ছবিটি বিশ্লেষণ করে জানায়, এতে গুগলের ‘সিন্থআইডি’ প্রযুক্তির অদৃশ্য ডিজিটাল জলছাপ রয়েছে। অর্থাৎ ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হয়েছিল এবং সেটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে গুগলের প্রযুক্তি। সিন্থআইডি মূলত এমন একটি অদৃশ্য ডিজিটাল স্বাক্ষর, যা মানুষের চোখে দেখা যায় না। কিন্তু বিশেষ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। এই জলছাপ ছবির ভেতরেই এমনভাবে যুক্ত করা হয় যে, ছবি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা হলেও বা স্ক্রিনশট নেওয়া হলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রেই অক্ষত থাকে। ফলে ভুয়া ছবি শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
গুগল ২০২৫ সালের ডেভেলপার সম্মেলনে এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে। এরপর থেকে তাদের জেমিনি এআই মডেল দিয়ে তৈরি ছবিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিন্থআইডি যুক্ত হচ্ছে। ২০২৬ সালে-ও একই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে, যাতে তাদের এআই দিয়ে তৈরি ছবিও যাচাই করা সম্ভব হয়। তবে এখনো এই ব্যবস্থায় অংশ নেয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই ভুয়া ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। নির্বাচনি প্রচারণা, রাজনৈতিক প্রচার, আর্থিক প্রতারণা কিংবা ব্যক্তিগত মানহানির মতো ঘটনায় ডিপফেকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তাই কনটেন্টে নির্ভরযোগ্য পরিচয়চিহ্ন যুক্ত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে সিন্থআইডিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি কেবল সেইসব ছবি শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো এমন এআই প্ল্যাটফর্মে তৈরি হয়েছে যারা এই জলছাপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এই ব্যবস্থায় অংশ না নেয় বা কেউ অন্য পদ্ধতিতে ছবি তৈরি করে, তাহলে সিন্থআইডি দিয়ে তা শনাক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে।
তারপরও ম্যাককনেলের ভুয়া ছবির ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এআই-সৃষ্ট বিভ্রান্তি মোকাবিলা করা সম্ভব। তথ্য যাচাই, ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং এআই নির্মাতাদের পারস্পরিক সহযোগিতা মিলেই ভবিষ্যতে ডিপফেকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, সত্যকে সুরক্ষিত রাখার লড়াইও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

