চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক থাকা ৫৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী সাইফুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের অন্তত ৮২ জন ক্যাডার কর্মকর্তা পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫৭ জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের বরখাস্ত করা হবে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকা, অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় এমন চার পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে পৃথক চারটি প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনে সই করেন সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন- ডিএমপির সাবেক এডিসি ও জামালপুর ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিশু বিশ্বাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাবেক র্যাব-১৪, ময়মনসিংহ) জুয়েল চাকমা, রাজারবাগ পুলিশ টেলিকম অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হাসান এবং সাবেক শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার (বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত ও পলাতক) আফজালুন নেছা।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিশু বিশ্বাস ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ১০ দিনের ছুটি নিয়ে দেশ ত্যাগ করেন। নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে তিনি অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকেন। তার স্থায়ী ঠিকানায় একাধিক নোটিশ পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিধি মোতাবেক গুরুদ- হিসেবে মিশু বিশ্বাসকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।
র্যাব-১৪-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জুয়েল চাকমা ২০২৫ সালের এপ্রিলে ছয় দিনের ছুটি শেষে কর্মস্থলে আর ফিরে আসেননি। দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকেও চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৩৫তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের কর্মকর্তা আফজালুন নেছা ২০১৭ সালে ওরিয়েন্টেশন কোর্সে অংশ নিলেও পরে মৌলিক প্রশিক্ষণে যোগ দেননি। ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি। পরে ৩৬তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের সঙ্গে মৌলিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি যোগদান করেননি এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছেন। বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হাসান রাজারবাগ পুলিশ টেলিকম অফিসার হিসেবে কর্মকালীন ওমরাহ পালনের লক্ষ্যে ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সৌদি আরব যান। ছুটি শেষে কর্মস্থলে হাজির হওয়ার কথা থাকলেও তিনি হাজির হননি। তাকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও জবাব দেননি। বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চারটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব, অভিযোগের গুরুত্ব এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ পর্যালোচনার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে তাদের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদ- আরোপ করা হয়েছে। আদেশগুলো অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এদিকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক থাকা ৫৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সূত্র মতে, সম্ভাব্য বরখাস্তের তালিকায় আছেন- সহকারী পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ দালাল, সহকারী পুলিশ সুপার মো. আরিফুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রুবাইয়াত জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস. এম. জাহাঙ্গীর হাছান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মাসুদুর রহমান মনির, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. রাশেদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. রওশানুল হক সৈকত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস. এম. শামীম, সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আল ইমরান হোসেন, সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইমরুল এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মো. গোলাম রুহানী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরখাস্তের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, নূরে আলম মিনা, মো. আনিসুর রহমান, এ কে এম এহসানউল্লাহ, বিপ্লব বিজয় তালুকদার এবং টুটুল চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। এ তালিকায় সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার, উপপুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় আছেন। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাকি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ধাপে ধাপে একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

