ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করুন

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৫:৪৯ এএম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলামকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কোনো একক ব্যক্তির দুর্নীতির প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিয়োগব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নগর শাসনের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়, বরং সেই পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে একজন কর্মকর্তাকে বিতর্কিত সনদ, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ এবং একের পর এক অভিযোগ সত্ত্বেও দায়িত্বে বহাল রেখেছে।

রাজধানীর মতো একটি মহানগরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়। নগর পরিকল্পনাবিদদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে একটি শহরের ভবিষ্যৎ, অবকাঠামো, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার মান। সেখানে যদি এমন একজন ব্যক্তি দীর্ঘ ২১ বছর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিয়োগের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, তবে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগদান, সরকারি অর্থ অপচয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থেকে তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পেয়ে গেছেন। যদি সত্যিই দুর্নীতি দমন কমিশন, নগর প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগ পৌঁছেও থাকে, তাহলে এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।

বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন প্রকল্পের বিষয়টি। অভিযোগ অনুযায়ী, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও নাগরিকরা তার প্রত্যাশিত সুফল পায়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদি সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্প বাস্তব রূপ না পেয়ে থাকে, তাহলে সেটি কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি জনগণের করের টাকার প্রতি চরম অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেন? প্রশাসনিক বিধি-বিধান কি এতটাই দুর্বল যেকোনো নতুন আদেশ ছাড়াই দীর্ঘ দুই দশক একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব? যদি তা হয়ে থাকে, তবে এটি ব্যক্তি নয়, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতার প্রমাণ।

আশার কথা হলো, ইতোমধ্যে ডিএসসিসি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আমরা মনে করি,  ডিএসসিসি যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তার কাজ হতে হবে স্বচ্ছ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। শুধু সনদের সত্যতা যাচাই করলেই হবে না।  গত দুই দশকে তার দায়িত্ব পালন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিয়োগ প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলোও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা সংস্থাগুলোকেও সম্পৃক্ত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তদন্ত যেন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রতিহিংসা কিংবা প্রশাসনিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত না হয়। আবার রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের প্রভাবও যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে। জনগণ জানতে চায়, প্রকৃত সত্য কী, কারা দায়ী, এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়ে থাকলে সেই ক্ষতির দায় কে বহন করবে।

রাজধানীর নাগরিকদের করের টাকায় পরিচালিত একটি সিটি করপোরেশনে জবাবদিহির বিকল্প নেই। সিরাজুল ইসলাম ইস্যু তাই কেবল একজন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রের নেই।