ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

মোবাইল ব্যাংকিং খাতের সংকট ও পলিসি সংস্কার

মো. মোজাম্মেল হক মৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা
প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ০৫:৫০ এএম

(গতকালের পর)

কিন্তু এমএফএস কোম্পানিগুলোকে ঋণ দেওয়ার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, কারণ তাদের পর্যাপ্ত মূলধন নিরাপত্তা এবং খেলাপি ঋণ সামলানোর অবকাঠামো নেই।

ডিজিটাল ব্যাংকিং গাইডলাইন ২০২৩-এর প্রভাব : বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংক নীতিমালা জারি করেছে। এর ফলে বিকাশ বা নগদ সরাসরি ব্যাংক হতে না পারলেও, তাদের মূল প্রতিষ্ঠানসমূহ পৃথক ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ তপশিলি ব্যাংক হতে গেলে যে পরিমাণ পরিশোধিত মূলধন (ন্যূনতম ৫০০ কোটি টাকা) এবং কঠোর তদারকি লাগে, তা এমএফএসের মূল মডেলে নেই।

কোন কোন পদ্ধতিতে গ্রাহককে লাভবান করা যায়?

গ্রাহককে অলস পড়ে থাকা টাকার ওপর লাভবান করতে দুটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নীতিমালা সংশোধন করা সম্ভব:

দৈনিক গড় স্থিতি পদ্ধতি : ব্যাংকগুলোর মতো গ্রাহকের ওয়ালেটে প্রতিদিন দিনশেষে যে টাকা থাকবে, তার ওপর মাস শেষে ব্যাংক ভেদে ৪ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বার্ষিক সুদ দেয় যে ব্যবস্থা, সেই নিয়মে একটি নির্দিষ্ট হারে প্রফিট সরাসরি ওয়ালেটে যোগ হবে।

অটো-সুইপ ইন সুবিধা : কোনো গ্রাহকের ওয়ালেটে যদি ৫,০০০ টাকার বেশি টাকা ২৪ ঘণ্টার বেশি জমা থাকে, তবে গ্রাহকের অনুমতি সাপেক্ষে অ্যাপের মাধ্যমে সেই টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি মাইক্রো-সেভিংস বা বন্ডে রূপান্তরিত হয়ে যাবে, যা থেকে গ্রাহক দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে মুনাফা পাবেন এবং প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে তা আবার ওয়ালেটে ক্যাশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।

চার্জের বিশ্লেষণ : সেন্ড মানি ও ক্যাশ আউট কেন ফ্রি নয়?

গ্রাহকদের বড় অসন্তোষের জায়গা হলো ক্যাশ আউট চার্জ (১.৪৯%- ১.৮৫%) এবং সেন্ড মানি চার্জ। এটি কেন ফ্রি হচ্ছে না বা কমানো হচ্ছে না, তার পেছনে একটি বড় রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল কাজ করে। ১,০০০ টাকায় ১৮.৫০ টাকা ক্যাশ আউট চার্জ ধরলে তা যেভাবে বণ্টন হয়:

এজেন্ট কমিশন : প্রায় ৭০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ টাকা (অর্থাৎ ১৮.৫০ টাকার মধ্যে ১২-১৩ টাকাই) পেয়ে যান ফিল্ড পর্যায়ের রিটেল এজেন্ট, যিনি ফিজিক্যালি টাকাটা ক্যাশ দিচ্ছেন।

ডিস্ট্রিবিউটর কমিশন : প্রায় ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পান ডিস্ট্রিবিউশন হাউসগুলো।

মোবাইল অপারেটর : লেনদেনের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য মোবাইল অপারেটরদের একটি অংশ দিতে হয়।

বাটন মোবাইল ব্যবহারকারীদের প্রতিটি ‘স্টার টু ফোর সেভেন হ্যাশ’ ডায়াল সেশনের জন্য মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো বিকাশ বা নগদ থেকে বড় অংকের টাকা কেটে নেয়। এই কারিগরি খরচের অদৃশ্য ফাঁদটির বোঝাও পরোক্ষভাবে গ্রাহকের ওপরই এসে পড়ে।

বিকাশের নিজস্ব অংশ :

সব খরচ বাদ দিয়ে বিকাশের কাছে মূলত ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ (টাকা প্রতি ৩ থেকে ৪ টাকা) থাকে, যা দিয়ে তারা সার্ভার মেইনটেইন্যান্স, সফটওয়্যার সিকিউরিটি, কর্মী বেতন এবং ব্র্যান্ডিংয়ের খরচ চালায়।

বিশ্লেষণ : যেহেতু এই বিশাল এজেন্ট নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখতে হয়, তাই ক্যাশ আউট পুরোপুরি ফ্রি করা এই মডেলে অসম্ভব। তবে, ডিজিটাল পেমেন্ট (মার্চেন্ট পে) ফ্রি করা হয়েছে, কারণ সেখানে এজেন্টের প্রয়োজন হয় না।

ডিজিটাল টু ডিজিটাল লেনদেন ও ক্যাশলেস সোসাইটির বৈপরীত্য (অভিন্ন নিয়মের ফাঁদ)

একটি আদর্শ ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বা নগদবিহীন অর্থনীতির প্রধান শর্ত হলো, ডিজিটাল টাকা যখন এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরবে, তখন কোনো ঘর্ষণ বা চার্জ থাকবে না। অথচ বর্তমান বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

একজন গ্রাহক যখন কষ্ট করে ব্যাংকের টাকা বিকাশে আনেন (যা সাধারণত ফ্রি), কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই টাকা আবার ব্যাংকে ফেরত পাঠাতে যান (টান্সফার মনি/ব্যাংক লিংক), তখন তাকে ১% থেকে ১.৫% পর্যন্ত বড় অঙ্কের চার্জ দিতে হচ্ছে। এর মানে হলো, টাকাটা ডিজিটাল মাধ্যমেই থাকছে, কোনো ফিজিক্যাল ক্যাশ বা কাগজের নোটের লেনদেন হচ্ছে না, কোনো এজেন্টের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে না, তবুও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় একটি ডিজিটাল প্রসেসের জন্য গ্রাহকের পকেট কাটা যাচ্ছে। কাগজের নোট বা ক্যাশ টাকা প্রিন্ট করতে, এটিএম বুথে সিকিউরিটি দিতে এবং তা পরিবহনে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ খরচ হয়। এর বিপরীতে ডিজিটাল ট্রানজেকশনে এই খরচ শূন্যের কাছাকাছি।

তবুও বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতিমালায় কোম্পানিগুলোকে প্রতি ট্রানজেকশনে পার্সেন্টেজ (%) বা শতকরা হারে চার্জ কাটার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যা নীতিমালার একটি বড় ভুল। ক্যাশলেস সোসাইটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হলে এই ‘শতকরা চার্জ প্রথা’ বাতিল করে ইন্টার-অপারেবল বা আন্তঃঅপারেটর লেনদেনে সর্বোচ্চ ‘ফ্ল্যাট ২-৩ টাকা সার্ভিস চার্জ’ নির্ধারণের নীতি প্রবর্তন করা দরকার।

বর্তমান নীতিমালার দুর্বলতা : গ্রাহক যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাৎসরিক ক্ষতির হিসাব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান এমএফএস রেগুলেশনস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি মূলত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা এবং ব্যাংকের নিরাপত্তা সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে তৈরি, যেখানে গ্রাহক স্বার্থ উপেক্ষিত। প্রধান দুর্বলতাগুলো হলো:

একচেটিয়া চার্জ নির্ধারণের স্বাধীনতা : বর্তমান নীতিমালায় ক্যাশ আউটের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে, কিন্তু কোনো ‘সর্বনি¤œ সীমা’ বা ‘ব্যয়ভিত্তিক চার্জ’ নির্ধারণের বাধ্যবাকতা নেই। ফলে কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমতো চার্জ চাপিয়ে দিচ্ছে।

ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের মুনাফা বণ্টনের অস্পষ্টতা : নীতিমালায় বলা আছে ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের সুদের টাকা ‘গ্রাহক কল্যাণে বা অফারে’ ব্যয় হবে। কোম্পানিগুলো কায়দা করে এই টাকা বিভিন্ন রিওয়ার্ড বা স্ক্র্যাচ কার্ডের অফার হিসেবে দেখায়, যা সব গ্রাহক সমানভাবে পায় না। সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো কোনো ষবমধষ প্রফিট দেওয়া হয় না।

ইন্টার-অপারেবিলিটি বা আন্তঃলেনদেনের উচ্চ ফি : এক এমএফএস  থেকে অন্য এমএফএস (যেমন বিকাশ থেকে নগদ) বা এমএফএস থেকে ব্যাংকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে নীতিমালার দুর্বলতার কারণে কোম্পানিগুলো চড়া ইন্টারচেঞ্জ ফি আরোপ করে রেখেছে।

সুপ্ত অ্যাকাউন্ট ও নমিনি নীতিমালার জটিলতা : দেশে লাখ লাখ এমন অ্যাকাউন্ট আছে যা ২-৩ বছর ধরে বন্ধ বা অব্যবহৃত। এই অ্যাকাউন্টগুলোতে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা অলস পড়ে আছে।

বর্তমান নীতিমালায় এই টাকা দীর্ঘ সময় অবিকৃত থাকলে তা কীভাবে বা কার কাছে ফেরত যাবে, তার সুনির্দিষ্ট স্বয়ংক্রিয় গাইডলাইন সাধারণ গ্রাহকের জানা নেই। এ ছাড়া কোনো গ্রাহক মারা গেলে তার ওয়ালেটের টাকা নমিনির তুলতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যায়। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো গঋঝ অ্যাপে নমিনি যুক্ত করার সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা না থাকায় মৃত ব্যক্তির প্রান্তিক পরিবার মাসের পর মাস ঘুরেও সেই টাকা উদ্ধার করতে পারে না।

প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব

বাকিঅংশ আগামীকাল