ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

সম্পাদকীয়

পাহাড়ে মৃত্যু রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

বাংলাদেশে বর্ষা যেন কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে একের পর এক প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর খবরও। পাহাড়ধস এখন আর আকস্মিক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, পরিবেশ ধ্বংস এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার নির্মম প্রতিফলন। প্রতিবছরের মতো এবারও টানা বর্ষণে কক্সবাজারে ১৮ জন এবং চট্টগ্রামে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছেন। এই মৃত্যু প্রকৃতির হাতে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের অব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কাছে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুগুলো কারো কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল না। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগেই ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছিল। প্রশাসনও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে মাইকিং করেছে, আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে, নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই ধরনের সতর্কতা দিয়েও যদি একই ধরনের মৃত্যু ঘটে, তাহলে এই প্রস্তুতির কার্যকারিতা কোথায়? দুর্যোগের কয়েক দিন আগে তৎপরতা দেখিয়ে বছরের বাকি সময় নিশ্চুপ থাকলে তাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলা যায় না, সেটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা।

চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি ৩৪টি পাহাড়ে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস, গত এক দশকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি এবং ছয় হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনার অস্তিত্ব রয়েছে।

এটিও সত্য যে, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়েই সেখানে থাকেন। নিরাপদ আবাসনের বিকল্প না থাকলে তারা ঝুঁকি নিয়েই জীবন কাটাবেন। তাই উচ্ছেদই সমাধান নয়; টেকসই পুনর্বাসনই হতে হবে রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার। সংবিধান নাগরিকের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করেছে, নিরাপদ বাসস্থানও তারই অংশ। দরিদ্র মানুষের মাথার ওপরের ছাদ কেড়ে নেওয়া সহজ, কিন্তু বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পাহাড় কাটা রোধে মামলা হয়েছে, জেল-জরিমানা হয়েছে এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগও চলমান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। যদি ব্যবস্থা কার্যকর হতো, তবে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বছরে বছরে বাড়ত না, পাহাড় কাটাও অব্যাহত থাকত না। দুর্যোগ এলেই তৎপরতা আর দুর্যোগ শেষ হলেই নীরবতাÑ এই চক্র ভাঙতে না পারলে পাহাড়ধসের পুনরাবৃত্তিও বন্ধ হবে না।

এখন সময় এসেছে মৌসুমি উদ্যোগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। সরকারকে প্রথমত ঝুঁকিপূর্ণ সব পাহাড়ের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেখানকার বাসিন্দাদের পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। সেই সঙ্গে, পাহাড় কাটা, দখল এবং অবৈধ বসতি নির্মাণে জড়িত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

কোনো সরকারি সংস্থা যাতে অবৈধ বসতিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি কিংবা অন্য কোনো সেবা সংযোগ না দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পাহাড়ি এলাকার ভূমি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করে একটি স্থায়ী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি আদালতে ঝুলে থাকা উচ্ছেদ-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে আইনি জটিলতা অপরাধীদের রক্ষাকবচে পরিণত না হয়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজে নয়, বরং দুর্যোগের আগেই মানুষের জীবন রক্ষার সক্ষমতায়। প্রতিবছর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি এবং একই ধরনের মৃত্যুকে নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়া কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। পাহাড়ধসে নিহত প্রতিটি মানুষের মৃত্যুর দায় কেবল প্রকৃতির নয়; এর দায় নীতিনির্ধারকদেরও। সরকার যদি এখনই কঠোর, মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নেয়, তবে আগামী বর্ষায়ও সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় একই শিরোনাম ফিরে আসবে, আর পাহাড়ের বুক চাপা পড়ে নিভে যাবে আরও কিছু নিরীহ প্রাণ।