× UCB Sticker Card
রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আল শাহারিয়া, পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:২২ এএম

দেশের খাদ্য সুরক্ষায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব

আল শাহারিয়া, পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:২২ এএম

দেশের খাদ্য সুরক্ষায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বর্ধিত জনসংখ্যার মুখে দেশের সবার জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ)-এর মতে, একটি আদর্শ খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার চারটি মূল স্তম্ভ রয়েছে। এগুলো হলোÑ খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যের অভিগম্যতা, খাদ্যের সঠিক ব্যবহার এবং স্থিতিশীলতা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি সত্ত্বেও দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। এই বাস্তবতা থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। আমাদের খাদ্য সংকটের জন্য কি কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধিই দায়ী, নাকি আমাদের সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য কাঠামোগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী?

গত ২০ থেকে ২৫ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মাথাপিছু খাদ্য চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২১ কোটি ৫৪ লাখে এবং তখন বছরে চালের প্রয়োজন হবে প্রায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন, যা পূরণ করা সম্ভব হবে কেবল ধান চাষের জমির পরিমাণ না কমলে। আমাদের প্রধান খাদ্য চালের ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও, অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষ করে গম, বিভিন্ন ধরনের ডাল এবং ভোজ্যতেলের চাহিদার সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে মেটাতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করছে।

জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাসস্থানের জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে। একইসঙ্গে শিল্পায়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং নদীভাঙনের কারণে আবাদযোগ্য কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে আবাদি জমি ১৯.৮৩ লাখ একরে নেমে এসেছে, যা আগে ছিল ২০.০৮ লাখ একর, অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে আবাদি জমি কমেছে ১ শতাংশ, যা গত এক দশকে সর্বোচ্চ হ্রাসের ঘটনা।

কৃষিজমি কমলেও গত কয়েক দশকে উচ্চফলনশীল জাতের বীজ, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে একই জমিতে উৎপাদন অনেক বেড়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, উৎপাদনের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা এখন স্থবির হতে শুরু করেছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা চরমভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

কৃষি গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে, আমাদের মাটির স্বাস্থ্য এখন বেশ হুমকির মুখে। মাটিতে উপকারী অণুজীব বা সয়েল মাইক্রোবায়োম এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর পাশাপাশি কৃষিতে দেখা দিয়েছে তীব্র পানি সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অসময়ে প্রলয়ংকরী বন্যা এবং তীব্র তাপপ্রবাহ সরাসরি ফসল উৎপাদন ব্যাহত করছে। ওচঈঈ-এর একটি প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, পরিবর্তিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার সম্মিলিত প্রভাবে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ধান ও গম উৎপাদন ১৯৯০ সালের তুলনায় যথাক্রমে প্রায় ৮ ও ২৩ শতাংশ কমতে পারে।

খাদ্য উৎপাদনের মূল কারিগর কৃষকদের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত শোচনীয়। সার, বীজ ও জ্বালানির মতো কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে যুবসমাজ কৃষি পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে কৃষিকাজ মূলত বয়স্ক কৃষকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের কৃষক পরিবারের একটি বড় অংশই প্রান্তিক চাষি, যাদের জমির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত, ফলে কৃষিজমি অকৃষি খাতে রূপান্তরিত হওয়ার সরাসরি চাপ এই প্রান্তিক কৃষকদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়ছে। অন্যদিকে, বাজারে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

আমরা কষ্ট করে যত খাদ্য উৎপাদন করি, তার একটি বিশাল অংশ আমাদের নিজেদের অব্যবস্থাপনার কারণে অপচয় হয়। জাতীয় সংসদে খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (টঘঊচ)-এর ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, আধুনিক হিমাগারের অভাব এবং অনুন্নত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকের মাঠ থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই প্রচুর ফসল নষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভোক্তা পর্যায়েও, বিশেষ করে রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রচুর পরিমাণ তৈরি খাবার ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে, যা এই সংকটের সময়ে চরম অনুচিত।

খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় পুষ্টির বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। পেট ভরে পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ করা মানেই পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নয়। বিবিএসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয়। ২০২১ সালে জনপ্রতি ফলের প্রাপ্যতা ছিল প্রায় ১১.১৫ গ্রাম এবং শাকসবজির প্রাপ্যতা প্রায় ৬.৪৮ গ্রাম, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আমাদের খাদ্যাভ্যাস অত্যধিক মাত্রায় ভাতনির্ভর। পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোকে চালের ওপর এই একক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প শস্য এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। খাদ্যাভ্যাসে বেশি মাংসের বদলে যদি আমরা উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারি, তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা পরিবেশ ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য উভয়ের জন্যই অত্যন্ত লাভজনক হবে।

মাটির স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রাকৃতিক কৃষি একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে। এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করায় উৎপাদন খরচ কমে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত হয়। তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাকৃতিক কৃষিতে ফলন কমে যাওয়ার একটি বড় ঝুঁকি থাকে, যা বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাই এককভাবে প্রাকৃতিক কৃষির ওপর নির্ভর না করে বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক কৃষি ও প্রাকৃতিক পদ্ধতির একটি সুসমন্বিত রূপ প্রয়োগ করা বেশি বাস্তবসম্মত।

গত ২০ থেকে ২৫ বছরের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার তুলনা করলে বেশ কিছু স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে। অতীতের তুলনায় এখন প্রযুক্তি ও ফলন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আমদানিনির্ভরতা, কৃষিজমি হ্রাস, জলবায়ু ঝুঁকি ও খাদ্য অপচয়ও একইসঙ্গে বহুগুণ বেড়েছে। পুষ্টির দিক থেকে আগে ক্যালরি ও পুষ্টি উভয়েরই ঘাটতি ছিল, বর্তমানে ক্যালরি প্রাপ্যতা বাড়লেও ফল ও শাকসবজির প্রাপ্যতা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম, ফলে পুষ্টির ঘাটতি রয়েই গেছে।

সার্বিক আলোচনা ও পরিসংখ্যান থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের খাদ্য সুরক্ষার সংকট একটি জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। এর জন্য কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে এককভাবে দায়ী করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে ক্রমাগত কৃষিজমি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, মাটির অবক্ষয়, ব্যাপক খাদ্য অপচয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় সাড়ে ২১ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে হলে বর্তমান প্রবণতা পরিবর্তন করা ছাড়া উপায় নেই। ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজমি রক্ষা, মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, খাদ্য অপচয় হ্রাস, বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রাকৃতিক কৃষির সমন্বয় এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। সঠিক নীতি ও সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল একটি ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিকর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!