ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

চাঁদপুর সদর

প্রাথমিকে সিলেবাস বাণিজ্য

আল আমিন ভূঁইয়া, চাঁদপুর
প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম

শিশুদের জন্য সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক। সংবিধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক ঘোষণা করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, স্কুল ব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণের মতো রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রদানের নিয়ম থাকলেও চাঁদপুরে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সিলেবাস বিক্রির নামে রীতিমতো বাণিজ্য চলছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নামমাত্র মূল্যের সিলেবাসের বিপরীতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায়ের এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা অফিস থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য যে সিলেবাস সরবরাহ করা হয়, তার একেকটির মুদ্রণ ব্যয় প্রায় দুই টাকা। অথচ এর সরকারি বা নির্ধারিত মূল্য ধরা হয়েছে আট টাকা। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় স্কুলগুলোতে এই সিলেবাস বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে। এরপর বিদ্যালয়গুলোতে এই সিলেবাস শিক্ষার্থীদের কাছে ১০ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত চড়া মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে।

সদর উপজেলার মৈশাদী ও আশপাশের একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, বছরের মাঝামাঝি সময়ে সিলেবাস হাতে পাওয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে। ষোলোঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল জানান, তারা প্রতি কপি ৭ টাকায় কিনেছেন। তবে মৈশাদী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিন্দু চক্রবর্তী স্বীকার করেন, তিনি ৮ টাকায় কিনে ১৫ টাকা করে বিক্রি করেছেন। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি যাতায়াত খরচ ও অফিসের আনুষঙ্গিক ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে দায় সারেন।

অব্যাহত এই অনিয়মের বিষয়ে সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম মিজানুর রহমান প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তিনি জানান, আদায়ের এই অর্থ কেবল ছাপানোর জন্য নয়; এতে শিক্ষকদের সম্মানি, পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার মতো একটি অবৈতনিক খাতে সরকারি অর্থায়নের বাইরে ব্যক্তিগত সম্মানি বা অন্যান্য খরচের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই।

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষা অফিসের তদারকির অভাবে প্রধান শিক্ষকরা এখন নিজেদের ইচ্ছামতো অর্থ আদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন। বছরের মাঝামাঝি সময়ে সিলেবাস বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষাকার্যক্রমের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই অর্থ আদায়ের কোনো রসিদও দেওয়া হচ্ছে না।

সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষাকে বাণিজ্যমুক্ত করতে হলে এই সিলেবাস সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হবে।

এ প্রসঙ্গে চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সিলেবাসের নামে অর্থ নির্ধারণ বা আদায় করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’