গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন একটি সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে যেতে শুরু করেছে। হাত দিয়েই কার্পেটিং তুলে ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তোলায় এলাকাবাসী ও সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ায় গণমাধ্যম কর্মীদের হুমকি দিয়েছেন ঠিকাদার ইয়াছিন শেখ। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের প্রায় প্রতিটি ধাপেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও কারিগরি অনিয়ম করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের কয়েকটি স্থানে কার্পেটিংয়ের স্তর হাতের স্পর্শেই উঠে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, রাস্তার দুই পাশে প্রায় তিন ফুট করে মাটির শোল্ডার নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে তার কোনো বাস্তব চিহ্ন নেই। এ ছাড়া এজিংয়ের কাজে পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্পেটিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রাইম কোট ও ট্যাক কোট যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় এবং বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ে মান বজায় না রাখায় কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি আমতলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তুহিন হাওলাদার তার ফেসবুক পেজে একটি লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে রাস্তার কার্পেটিং হাত দিয়ে তুলে ফেলার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’-এর আওতায় প্রায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে প্রায় ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের
রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কার্যাদেশ পায় চুয়াডাঙ্গার জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন গোপালগঞ্জের ঠিকাদার ইয়াছিন শেখ। স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, শুরু থেকেই নিম্নমানের ইট-খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। তিন ইঞ্চি সিসি ঢালাই দিয়ে গাইড ওয়াল নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে নামমাত্র ঢালাই করা হয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের ইট, বালু ও পোড়া মাটির খোয়া
ব্যবহার করায় রাস্তার স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে কিছু বললেই আমাদেরসহ সাংবাদিকদের নামে চাঁদাবাজি মামলায় ফাসানোর ভয় দেখান ঠিকাদার ইয়াসিন শেখ। তার দাবি, এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা থাকার কথা নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ মাহমুদ বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ২৫ মিলিমিটার পুরুত্বের কার্পেটিং করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। কার্পেটিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় বিটুমিন ছিটানোও যথাযথভাবে করা হয়নি বলে তার অভিযোগ। তিনি বলেন, আমি নিজেই কয়েকটি স্থানে পরিমাপ করে দেখেছি, কোথাও ২৫ মিলিমিটার পুরুত্ব পাওয়া যায়নি। এভাবে নির্মিত রাস্তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। পুরো রাস্তা নতুন করে কার্পেটিং করা প্রয়োজন।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী বেলাল হোসেন বলেন, কোটালীপাড়ায় ঠিকাদার ইয়াছিন শেখের বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পে অতীতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর আগে এই ঠিকাদারের অন্য একটি রাস্তার অনিয়ম নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিন গিয়েও অনিয়ম দূর করতে পারেননি। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। এলজিইডির বাইরে একটি স্বাধীন কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগুফতা হক বলেন, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি দেখেছি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে এলজিইডির গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এহসানুল হক বলেন, সড়কটির বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর আমাদের কারিগরি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেছে। তদন্তে কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী কাজ করতে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন