কক্সবাজারের নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার, প্রমাণহীন অভিযোগ ও ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে চাপে ফেলছে এবং দায়িত্ব পালনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কোনো দাবি পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রচার করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত ঘটনা যাচাইয়ের আগেই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার (২৮ জুন) এক নারীর কান্নাজড়িত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে ঈদগাঁও থানার এক এএসআই কর্মকর্তা অন্তু বড়ুয়ার বিরুদ্ধে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তবে অভিযোগের সমর্থনে কোনো কল রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা অন্য কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযোগকারী সাবেকুন্নাহার একটি অনলাইন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অভিযোগের তদন্তে আদালতের পূর্বানুমতি চেয়ে আবেদন করা হয় এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহের জন্য রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিঠি পাঠানো হয়। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তদন্তকারী কর্মকর্তার ওপর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, পরবর্তীতে অভিযোগকারী পক্ষ থেকেই আগের বক্তব্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু তথ্য সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেকুন্নাহারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাবেকুন্নাহারের বাবা সৈয়দ করিম ও ভাই ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না এবং ওই নারীর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সাবেকুন্নাহার ঈদগাঁওয়ের স্থায়ী বাসিন্দা নন; তিনি ভাড়া বাসায় থাকেন। তাদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে তাকে ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নাঈমুল ইসলাম বলেন, তিনি স্থানীয় মেয়ে নন। এখানে ভাড়া বাসায় থাকেন বলে শুনেছি।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুধু এই ঘটনাই নয়; ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে নিয়মিতভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়া পোস্ট, ফটোকার্ড ও নানা অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে কর্মকর্তারা মানসিক চাপে পড়ছেন এবং কর্মস্পৃহা হারাচ্ছেন।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) যোগদানের এক মাস না পেরোতেই বদলি হয়েছেন। এর আগে দায়িত্ব পালনকারী ইউএনওও ছিলেন মাত্র দুই মাস। ফলে ছয় মাসে তিনজন ইউএনও বদলির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাও সম্প্রতি বদলি হয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে অনেকের ধারণা, বিরূপ কর্মপরিবেশ ও অতিরিক্ত চাপের কারণেই কর্মকর্তারা অন্যত্র বদলির চেষ্টা করছেন। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে ঈদগাঁও উপজেলার কৃষি, সমাজসেবা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), এলজিইডি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য বিভাগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
ঈদগাঁও থানার ওসি সিফাতুল মাজদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই ছাড়া অপপ্রচার চালানো আইনত দণ্ডনীয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার রয়েছে, তবে তা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। গুজব ও অপপ্রচার থেকে বিরত থেকে সত্য তথ্য প্রচারে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।
ঈদগাঁও উপজেলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেফায়েল উদ্দিন বলেন, কোনো কর্মকর্তা চাহিবা মাত্র কাজ না করলেই শুরু হয় সাইবার বুলিং। এতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আতঙ্কের স্থান হয়ে পড়েছে ঈদগাঁও উপজেলা।
সচেতন মহলের মতে, কোনো অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। প্রমাণহীন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা যেমন নির্দোষ ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটাতে পারে, তেমনি প্রকৃত অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এলাকাবাসী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ও সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন