× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মোহাম্মদ সোহেল রানা

প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২৫, ১২:০৯ পিএম

যে গল্প হৃদয়ে গাঁথা

মোহাম্মদ সোহেল রানা

প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২৫, ১২:০৯ পিএম

লেখক ও বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

লেখক ও বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

গল্প কেবল কল্পনার গাঁথুনি নয়, গল্প আসলে আমাদেরই প্রতিচ্ছবি। আমরা যখন কোনো গল্পে নিজের ছায়া দেখি, তখনই সেই গল্প আমাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। হৃদয়ের স্পন্দন ছুঁয়ে না গেলে, কোনো লেখা গল্প হয়ে ওঠে না, হয়তো শুধু বাক্যের একটি সমাহার হয়ে থাকে।

তেমনই এগারোটি গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের ‘এখানে কয়েকটি জীবন’ বইটি। যেখানে প্রতিটি চরিত্র যেন আমাদের চেনাজানা কারো প্রতিচ্ছবি। হাসি-কান্না, স্বপ্নভঙ্গ আর ক্ষণিক সুখের টুকরোগুলো মিলে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের এক পরিপূর্ণ চিত্র- যেখানে পাঠক শুধু পাঠক হয়ে থাকতে পারে না, হয়ে ওঠেন গল্পেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বইয়ের প্রথম গল্প ‘জীবন’। একই শহরে বসবাস রিজিয়া ও আনিস এবং ছুমাইয়া ও বারেক দম্পতির। তাদের জীবনকে ঘিরেই গল্পটি সাজানো হয়েছে। আনিস ও রিজিয়ার সাত বছরের সংসারে সুখ-সচ্ছলতা থাকলেও অভাব শুধু একটাই সন্তানের। বহু চিকিৎসা, অপেক্ষা আর প্রার্থনার পরও সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি। সন্তানের অভাবে যেন তাদের মনও ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকে।

হঠাৎ একদিন চোখ পড়ে একটি বিজ্ঞাপনের, অভাবের তাড়নায় এক মা তার গর্ভের সন্তান বিক্রি করতে চায়। বিস্ময় আর সংশয়ের মধ্যেও আনিস সেই পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছুমাইয়া ও বারেক দম্পতি, কঠিন বাস্তবতায় সন্তানকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সবকিছু ঠিকঠাক মতো এগোয়। চুক্তি হয়। আনিস ও রিজিয়া সেই গর্ভজাত শিশুকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়। নিয়মিত খোঁজ রাখেন, দায়িত্ব নেন চিকিৎসার, আর গড়ে তোলেন এক মানবিক সম্পর্কও।

শেষমেশ, সন্তান জন্ম নেয়। সুস্থ-সবল এক পুত্রসন্তান। কিন্তু যখন তাকে নেওয়ার মুহূর্ত আসে, রিজিয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। যে ছুমাইয়া সন্তানকে নিজের শরীরে ধারণ করেছেন, তার বুক খালি করে নিজের বুক ভরাতে নারাজ রিজিয়া। বরং বলে তিনি বলেন, “ছেলেটা তোমার কাছেই থাকবে ছুমাইয়া। আমি এতেই তৃপ্ত যে তোমাদের পাশে থাকতে পেরেছি।”

রিজিয়ার কথা শুনে ছুমাইয়া-বারেক কেঁদে ফেলেন। আনিস-রিজিয়ার চোখেও অশ্রু, তবে ঠোঁটের কোণে হাসি।

গল্পটি কেবল নিঃসন্তান এক দম্পতির যন্ত্রণা নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের গভীরতা, ত্যাগ, সহমর্মিতা আর অনন্য ভালোবাসার এক চিত্র ফুটে তুলছেন লেখক। জীবনে সব চাওয়া পূরণ না হলেও মানুষ মানুষের জন্য, এই সত্যটিই যেন গল্পটিকে করেছে চিরন্তন।

বইয়ের তৃতীয় গল্প ‘শাড়ি’। ‘শাড়ি’ গল্পটিতে এক গ্রামীণ পরিবারের আবেগ, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও পারিবারিক বন্ধনের এক নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক।

আজম নামের এক যুবক প্রথম চাকরির পেয়ে সাত মাস পর ছুটিতে গ্রামে বাবা-মায়ের কাছে আসেন। তার বাবা মকবুল ও মা মজিতন। তারা সাধারণ কৃষক পরিবারে জীবন কাটালেও ছেলেকে মানুষ করতে কোনো কমতে রাখেননি। আয় বেশি না হলেও মায়ের জন্য একটি শাড়ি ও বাবার জন্য একটি ফতুয়া কিনে আনেন আজম।

নতুন কাপড় হাতে নিয়ে মজিতনের চোখ ভরে আসে আনন্দের অশ্রুতে; তার জীবনে এমন উপহার দুর্লভ। বাবাও গর্ব বোধ করেন। সেই রাতে পরিবারের মাঝে যেন এক অসময়ের ঈদের আনন্দ। রান্না হয় নানার পদের খাবারও। আসেন শিউলি ও তার পরিবার। পাশাপাশি, আজম ও শিউলির ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও কথা হয়। তবে তাৎক্ষণিক বিয়েতে নয়, তারা সময় চায় স্বপ্ন পূরণে। যেখানে সম্মান, ভালোবাসা ও বাস্তবতা- একসঙ্গে পথ চলার ইঙ্গিত দেয়।

গল্পটি মূলত পরিবারের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ছেলে-মেয়ের দায়িত্বশীলতা এবং ছোট ছোট আনন্দে বড় তৃপ্তি খোঁজার বিষয়টি তুলে ধরেছেন লেখক। যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ছোট কিছু মনোযোগ, উপহার বা যত্ন- পরিবারের জন্য বিশাল হয়ে ওঠে।

‘এখানে কয়েকটি জীবন’ এর গল্পগুলোর মাঝে অন্যতম হচ্ছে ‘বিবস্ত্র’। যা বইয়ের চতুর্থ গল্প। গল্পটি এক ছিন্নমূল সুবিধাবঞ্চিত শিশু ‘রুবির’ জীবনের করুণ বাস্তবতা, সামাজিক অবহেলা ও শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ পরিণতির হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক।

রুবির বয়স নয়-দশ, জন্ম থেকে বেড়ে উঠেছে রাস্তায়। তার নিজের পরিচয়, পরিবার, নিরাপত্তা- কোনোটাই নেই। ছোট্ট জীবনে তার একমাত্র সঙ্গী পথের বন্ধুরা। অভাব, অনিশ্চয়তা আর মাঝে মাঝে লুকিয়ে আসা ভয়াবহ যৌন হয়রানি তার প্রতিদিনের সঙ্গী।

এই অন্ধকার জীবনে একটুখানি আলো হয়ে আসে আরেক সুবিধাবঞ্চিত ছেলে সুজন। যার সঙ্গে গড়ে ওঠে এক মমতাভরা বন্ধুত্ব। ভালোবাসা না হলেও, সম্পর্কটিতে ছিল নিঃস্বার্থ যত্ন। কিন্তু রুবির দুষ্টুমিতে রাগ করে একদিন সুজন তাকে ছেড়ে চলে যায়। আর ঠিক সেদিন রাতেই রুবির জীবনে নামে নির্মম অন্ধকার।

শীতের এক নীরব রাত, শহীদ মিনারের পেছনে রুবি তিনজন মানুষরূপী পশুর কাছে নির্যাতিত হয়ে নিঃশব্দে মারা যায়।

পরদিন সকালে, সুজন টেলিভিশনে দেখে চিৎকার করে ওঠে- ‘ওর নাম রুবি। অয় তো কোনো অপরাধ করে নাই। অরে মারছে কেডা?’ কিন্তু কেউ শোনে না। রাস্তায় থাকা মানুষ, পথচারী, রিকশাওয়ালা- সবার চোখে রুবি কেবল অজ্ঞাতনামা। কারণ, রুবিরা এ সমাজের কেউ না।

এই গল্পে রুবি হলো আমাদের শহরের, সমাজের, রাষ্ট্রের সেই শত শত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতীক, যাদের নাম নেই, ঠিকানা নেই, অধিকার নেই। যাদের জীবনের মূল্য নেই, মৃত্যুতে বিচার নেই এবং বেঁচে থাকাটাও যেন এক অপরাধ।

গল্পটির এমন চিত্র বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়শই দেখি, কিন্তু কেউ অনুভব করি না। এখানে একজন কিশোরী শুধু সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার কারণে তার দুঃখ, ব্যথা, মর্যাদা- সব কিছু সমাজের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।

এই গল্পের মাধ্যমে লেখক সমাজের চেতনাহীনতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অভাব এবং শিশুদের প্রতি সহানুভূতির সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

বইয়ের বাকি গল্পগুলো হচ্ছে- ‘সোনাবউ’, ‘দায়ী’, ‘জয়শ্রী’, ‘কুমারী’, ‘নাকফুল’, ‘কুকুর’, ‘গোলেয়া’, ‘মিঠু’।

প্রতিটি গল্পের শিরোনাম এক শব্দে। মাত্র একটি শব্দে লেখক গল্পের মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেছেন। গল্পে প্রেম, অনাচার, অত্যাচার, মানবিকতা, জীবনের জটিলতা প্রভৃতি বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই প্রতিটি গল্পের নামকরণে অবশ্যই সার্থকতা রয়েছে।

সব মিলিয়ে এগারোটি গল্পের মাধ্যমে আমাদের সমাজের পুরো চিত্র ওঠে না আসলেও অনেক কিছু ‘এখানে কয়েকটি জীবন’ বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!