বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন প্রতিটি দেশের জন্য কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ অনেক দেশ তাদের জ্বালানির মজুত সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।
কিন্তু এর বিপরীতে বাংলাদেশে ৫৫ বছরেও বাড়ানো যায়নি জ্বালানির তেলের মজুত সক্ষমতা। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগও কোনো সরকারের আমলে পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক চাপের মুখে পড়তে হয় এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানোকে এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতি-চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লিখিত দেশগুলো সাধারণত ৯০ দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও তেল মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, যাতে সংকটের সময় অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির না হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি এসপিআর সবচেয়ে বড়, যেখানে প্রায় ৭০০ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে, যা সংকটকালে কয়েক মাস দেশটির চাহিদা মেটাতে পারে। চীন সরকারি ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত মজুত সক্ষমতা তৈরি করেছে। জাপান ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সাধারণত ৯০ দিনের আমদানি চাহিদা পূরণের মতো তেল মজুত সক্ষমতা রয়েছে। আর ভারতের বর্তমানে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ব্যারেল কৌশলগত মজুত সক্ষমতা রয়েছে।
অন্যদিকে বিপিসির দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা প্রায় সোয়া ১১ লাখ টন, যার মধ্যে পরিশোধিত তেল ডিজেল ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন, অকটেন ৫৩ হাজার ৬১৬ টন, পেট্রোল ৩৭ হাজার ১৩ টন, ফার্নেস অয়েল ১ লাখ ৪৪ হাজার টন, জেট ফুয়েল ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন। বাকি ২ লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বড় কোনো উন্নত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ব্যবস্থা নেই। তুলনামূলক এই সীমিত মজুতের কারণে বাংলাদেশ নানা ইস্যুতে জ্বালানি তেল নিয়ে বারংবার হোঁচট খাচ্ছে।
মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য নির্মিত এসপিএম (Single Point Mooring) প্রকল্পে দেড় লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ৭৫ হাজার টন পরিশোধিত তেল সংরক্ষণের সুবিধা রাখা হয়েছে। এই অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলেও অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত দুই বছর ধরে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় সোয়া দুই লাখ টন মজুত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা এখনো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারত। কারণ এটি একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাত, অন্যদিকে তেল পরিবহনের সময় ও খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করত। কিন্তু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু (ERL Unit-2) নির্মাণ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যমান পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেত। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ টন মজুত সক্ষমতা থাকলেও নতুন ইউনিট যুক্ত হলে তা বহুগুণে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে গত প্রায় ১৬ বছর ধরে প্রকল্পটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে থাকায় এর অগ্রগতি থমকে আছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত রয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, ‘বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং নীতিগত দুর্বলতা বড় সমস্যা। কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তোলা ছাড়া কোনো দেশই প্রকৃত অর্থে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্তত ৬০ থেকে ৯০ দিনের চাহিদা পূরণের মতো মজুত সক্ষমতা গড়ে তুলতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতি বারবার ঝুঁকিতে পড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে জ্বালানি পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। এক সরকার যে পরিকল্পনা নেয়, পরবর্তী সরকার তা এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেক সময় অনীহা দেখায়। ফলে বড় প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর আটকে থাকে।’
তার মতে, এসপিএম বা ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু’র মতো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও অনেক বেশি স্থিতিশীল হতো।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফখরুল ইসলাম মনে করেন, ‘বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় জ্বালানি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। তাই কৌশলগত মজুত গড়ে তুলতে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।’ তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি বিনিয়োগ ও তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সদস্য অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা যেকোনো জাতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল মজুত সক্ষমতা নিয়ে কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে মুনাফাভিত্তিক খাতে পরিণত করা হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেলের কৌশলগত মজুত বা সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার যেকোনো উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কিংবা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বাস্তবায়ন জটিলতা ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কেউ সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে এসপিএম প্রকল্প ও ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিলম্ব নিয়ে সরকারি পর্যায়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে তেলনির্ভরতা থেকে বের হয়ে গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মজুত সীমিত এবং আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। ফলে বহুমাত্রিক জ্বালানি উৎস নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তারা মনে করেন, জ্বালানি খাতে যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নে নানা জটিলতা তৈরি হয়, ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সময়সীমা দীর্ঘ হয়। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও বিঘ্নিত হয়। তাই প্রকল্পের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত দিকগুলো গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সময়মতো অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব বা অর্থায়নে অনিশ্চয়তা থাকলে কাজের গতি কমে যায় এবং খরচ বেড়ে যায়। পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব থাকলে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। এ কারণে মানবসম্পদ উন্নয়নকে জ্বালানি খাতের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
তারা জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা ছাড়া কোনো বড় প্রকল্প সফল করা সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় অবস্থান এবং কার্যকর প্রশাসনিক তদারকি অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশ যদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চায়, তবে জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব আরও গভীরভাবে দেশের ওপর পড়তে পারে।

