ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

মাদক প্রতিরোধে প্রয়োজন সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি

এ এইচ এম ফারুক
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ বর্তমানে কেবল প্রাকৃতিক কিংবা রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে না, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকে আসা মাদকের এক ভয়াবহ ও নীরব আগ্রাসনের শিকার। ইয়াবা, ফেন্সিডিল এবং ক্রিস্টাল মেথ আইসের মতো বিধ্বংসী মাদকগুলো সীমান্তের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে দেশের লাখ লাখ যুবকের জীবন ধ্বংস করছে। এই বিষাক্ত মাদকগুলো সেবনকারীর মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রে স্থায়ী ক্ষতি করে সাইকোসিস বা চরম মানসিক অসুস্থতা সৃষ্টি করছে, হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা নষ্ট করে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং ইনজেকটেবল মাদকের মাধ্যমে এইচআইভি ও হেপাটাইটিস-সির মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বহুমাত্রিক ধ্বংসযজ্ঞ এখন আর কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের সংকট নয়; এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক চরম হুমকি।

দেশে এ বছর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের মাদক পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। বিগত দীর্ঘ দেড় দশকের পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সীমান্তে ও দেশের ভেতরে মাদকের বিস্তার বিন্দুমাত্র কমেনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা আনুমানিক ৮৩ লাখ থেকে দেড় কোটিতে পৌঁছেছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী উদীয়মান তরুণ-যুবক। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিশাল তালিকার মধ্যে প্রায় পৌনে তিন লাখ নারী এবং আড়াই লাখের বেশি শিশু-কিশোরও জড়িয়ে পড়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে অতীতে বিভিন্ন সময় বড় আকারের অভিযান ও কঠোর আইনের তোড়জোড় দেখিয়ে ‘বজ্র আঁটুনি’র ভাব প্রকাশ করা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তা ‘ফস্কা গেরো’তেই পরিণত হয়েছে। কারণ, সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত মূল সরবরাহ চেইন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ‘গডফাদার’ ও নেপথ্যের অর্থায়নকারীদের বিরুদ্ধে কখনোই চূড়ান্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কেবল খুচরা বাহক গ্রেফতার হলেও মূল মাদক সাম্রাজ্য সবসময় নির্বিঘ্নে তাদের কারবার চালিয়ে গেছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত চিত্র বিশ্লেষণ করলে এই অবিচ্ছিন্ন সরবরাহের ভয়াবহ রূপ ফুটে ওঠে। বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সীমান্ত ব্যাটালিয়নেই প্রায় ৩ কোটি ৫৯ লাখ পিস ইয়াবা এবং দেড়শ কেজির বেশি মারাত্মক ক্রিস্টাল মেথ আইস জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১,৮২৬ কোটি টাকা। দেশজুড়ে বিগত দেড় দশকে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি পিস ইয়াবা, কোটি বোতল ফেন্সিডিল এবং শত শত কেজী আইস ও হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ১০ লাখের বেশি আসামিকে। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যক গ্রেফতার ও জব্দের পরও বাজারে মাদকের অভাব না হওয়া প্রমাণ করে যে, চোরাচালানের প্রধান রুট ও এর পেছনের আন্তর্জাতিক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এখনও অক্ষত রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের মাদক সংকটের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত রুট। মিয়ানমারের রাখাইন ও শান রাজ্যে তৈরি হওয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ আইস 'আরাকান করিডোর' দিয়ে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে প্রবেশ করছে। চোরাচালান চক্রগুলো বিপুল অর্থের প্রলোভনে স্থানীয় কিছু অসাধু চক্র ও আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কার্গো ট্রলার, স্পিডবোট বা হেঁটে সীমান্ত পারাপারের 'ক্যারিয়ার' হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে অব্যাহত রয়েছে ফেন্সিডিল, হেরোইন এবং বুপ্রেনরফিনের মতো ইনজেকটেবল ফার্মাসিউটিক্যালস ড্রাগের স্থির প্রবাহ। যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সীমান্ত পয়েন্টগুলো দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে এগুলো প্রবেশ করছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, এই সিন্ডিকেটের পেছনে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আঁতাত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক চক্র এই কারবারীদের প্রশাসনিক ও আইনি সুরক্ষা দেয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমান্ত থেকে আসা এই কালো টাকা ও মাদকের জাল পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। একজন সাধারণ মোটরসাইকেল চালক বা ছোট ব্যবসায়ী যখন রাজনৈতিক আশ্রয়ে কাঠ ব্যবসার আড়ালে কয়েক শত কোটি টাকার মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে এবং ঢাকায় একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় মূল গডফাদারদের হাত কত দীর্ঘ।

এই পরিস্থিতি কেবল সমাজ ধ্বংস করছে না, বরং সীমান্ত এলাকায় অস্ত্রধারী অপরাধী চক্রের উত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত নিরাপত্তার (Territorial Integrity) জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক জলসীমা ও স্থলসীমান্তে মাদকের চালান কেন্দ্রিক সশস্ত্র সংঘর্ষ ও সংঘাত জাতীয় নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।

আজ দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা মাদকের বিরুদ্ধে এক নতুন ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক সদিচ্ছা দেখতে চাই। এই প্রেক্ষাপটে আমি বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে মাদক সিন্ডিকেটের বিষদাঁত ভেঙে দিতে।

নতুন সরকারের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি ও প্রত্যাশা হলো—মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে সত্যিকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতি প্রয়োগ করতে হবে। কেবল মাঠপর্যায়ের ছোটখাটো সরবরাহকারী বা আসক্তদের গ্রেফতার না করে, তালিকাভুক্ত মূল 'মাদক গডফাদার', রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা এবং অবৈধ অর্থের মূল যোগানদাতাদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে হবে। মাদক বিক্রি থেকে উপার্জিত সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে এদের আর্থিক মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

একই সাথে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তিতে সজ্জিত করতে হবে এবং সীমান্ত পারাপারের রুটগুলো সম্পূর্ণ সিল করে দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দিতে হবে। মাদকের চাহিদা কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লায় ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি আসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পর্যাপ্ত সরকারি নিরাময় কেন্দ্র ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এই মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করা এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করা সরকারের জন্য এখন কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়, বরং এক পরম জাতীয় কর্তব্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাহসী ও কঠোর পদক্ষেপই পারে বাংলাদেশকে এই অভিশপ্ত মাদকের ছোবল থেকে মুক্ত করে এক সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক