ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

ইসলামে কালিমামুক্ত হৃদয়ের সন্ধান

মো.আশরাফুল ইসলাম
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য ও অনিন্দ্য সুন্দর অবয়বে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ক্বলব’ বা অন্তর। জন্মলগ্নে এই অন্তরটি থাকে একটি নিষ্কলুষ, সুদৃশ্য ও দীপ্তিময় স্ফটিক পাত্রের মতো স্বচ্ছ। কিন্তু এই নশ্বর পৃথিবীর কর্মব্যস্ততা, মোহাচ্ছন্নতা এবং সময়ের আবর্তনে সেই দ্যুতিময় পাত্রটি ধীরে ধীরে কুয়াশাচ্ছন্ন হতে শুরু করে। প্রথমত, অলক্ষ্যেই তাতে জমে সামান্য ধুলোবালি; অতঃপর অবহেলা আর উদাসীনতার স্তরে স্তরে তা জমাট বেঁধে একপর্যায়ে পুরো অন্তরকে একদম অন্ধকার ও কালিমালিপ্ত করে তোলে।

আসলে অন্তরের এই কালচে ময়লা বা কাদা অন্য কিছু নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পুঞ্জীভূত রাগ, ক্ষোভ, হিংসা, মিথ্যাচার, জাগতিক জীবনের প্রতি অন্ধ মোহ, অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা এবং অন্যের চেয়ে যে কোনো মূল্যে সেরা হওয়ার অহংকার। প্রতিদ্বন্দ্বীকে পিষে ফেলার মানসিকতা এবং প্রতিনিয়ত অন্যের নামে গীবত বা পরনিন্দা করার মতো মারাত্মক সব আত্মিক ব্যাধি ভাইরাসের মতো জেঁকে বসে মানুষের এই কলুষতার জন্ম দেয়।

তাজকিয়াহর সংজ্ঞা ও গুরুত্ব

ইসলামি পরিভাষায় অন্তরের এই কালিমামুক্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘তাজকিয়াহ’ বা আত্মশুদ্ধি। এটি মূলত সময়ের সাথে সাথে মলিন ও কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়া সেই স্ফটিক পাত্রটিকে আধ্যাত্মিকতার পরশে ঘষেমেজে আবার আয়নার মতো পরিষ্কার ও চকচকে করে তোলার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। তাজকিয়াহর সফল বাস্তবায়নে মানুষের অন্তর আবার তার আদি ও অকৃত্রিম স্বচ্ছ রূপে ফিরে আসে।

তখন মানুষের মনের মণিকোঠায় এই গভীর বোধ জাগ্রত হয় যে, সে এই পৃথিবীতে কেবলই আল্লাহর একজন খলিফা বা প্রতিনিধি এবং অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক মাত্র।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপমায় বিষয়টি আরও চমৎকারভাবে অনুধাবন করা যায়। শরীরে কোনো গভীর ক্ষত তৈরি হলে এবং তা সংক্রমিত হলে আমাদের প্রথম কাজ হয় ক্ষতস্থানটি খুব ভালোমতো পরিষ্কার বা ড্রেসিং করা। এরপর রোগীর চারপাশ থেকে সংক্রমণকারী নোংরা উপাদান বা পরিবেশ সরিয়ে ফেলা হয় এবং সবশেষে ক্ষতটি দ্রুত শুকিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাময়কারী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। অন্তরের পরিশুদ্ধিও ঠিক এই নিয়মে কাজ করে। হিংসা, গীবত, ঘৃণা কিংবা বিশ্বাসের অভাবের কারণে আমাদের অন্তর যখন গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়, তখন তাজকিয়াহর মাধ্যমে সেই ক্ষতগুলো একে একে নিরাময় করতে হয়। এটি ঠিক একটি নোংরা থালা-বাসন মাজার মতো; পাত্রটি পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত যেমন আমাদের অবিরাম তা মেজে যেতে হয়, অন্তরের ক্ষেত্রেও পরিচ্ছন্নতা না আসা পর্যন্ত এই ধোয়ার প্রক্রিয়া চালু রাখতে হয়।

নবুয়তের অন্যতম মৌলিক মিশন

তাজকিয়াহ বা অন্তরের এই পরিশুদ্ধি সেই তিনটি মৌলিক নবুয়তি দায়িত্বের একটি, যা দিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদকে (সা.) এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় হজরত ইব্রাহিমের (আ.) দোয়ার বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:

‘হে আমাদের রব! আপনি তাদের মধ্য থেকেই এমন একজন রাসুল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১২৯)

পবিত্র কোরআনে মোট চারবার এই পরিশুদ্ধির প্রসঙ্গের উল্লেখ এসেছে। ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি চিন্তাবিদগণের মতে, যখন একজন মানুষ দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান লাভ করে, তখন অন্তরের পরিশুদ্ধি বা তাজকিয়াহর পথে হাঁটা তার জন্য একটি ‘ফরজে আইন’ বা ব্যক্তিগত আবশ্যিক কর্তব্যে পরিণত হয়। এটি পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার মতোই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; যা একদিনে বা রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়।

আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ

এই আধ্যাত্মিক চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো নিজের ভেতরের সমস্যাটি অত্যন্ত সততার সাথে চিহ্নিত করা। রোগ নিরাময়ের আগে যেমন সঠিক ডায়াগনোসিস প্রয়োজন, তেমনি রোগীকে বুঝতে হবে তার আসল আত্মিক ব্যাধিটি কোথায়।

ক্রোধের ব্যাধি: আমার সমস্যা কি অতিরিক্ত রাগ? যে কারণে রেগে গেলে আমি আল্লাহর অবাধ্য হই, মুখে যা আসে তা-ই বলি এবং মানুষকে চরমভাবে কষ্ট দিই?

হিংসার ব্যাধি: নাকি আমার মূল সমস্যা হিংসা? কেন অন্য একজন একটি নেয়ামত বা সুযোগ পেল আর আমি পেলাম না, সে তো এটার যোগ্যই ছিল না, এমন হীনম্মন্যতায় কি আমি ভুগছি?

জিহ্বার অপব্যবহার: নাকি আমার সমস্যা জিভ বা মুখের কথায়? আমি কি কথা বলতে গিয়ে মানুষকে আঘাত করি, গিবত করি, মিথ্যা বলি কিংবা অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি?

সবার আগে নিজের এই ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং নিজেকে চেনার পর এই সমস্যাগুলো একে একে দূর করার কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে সৎ সঙ্গের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি জানি যে বন্ধুদের একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে আড্ডা দিতে বসলে দিনশেষে তা গিবত বা পরনিন্দার আসরে রূপ নেয়, তবে নিজের ভালো চাইলে আমাকে সেই বিষাক্ত সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।

কারণ তারা আপনার অন্তরের জন্য একটি মারাত্মক ভাইরাস। কিংবা আমি যদি জানি যে অমুক প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে গেলে আমার মনের ভেতরে এক ধরনের কুৎসিত হীনম্মন্যতা তৈরি হয় (কারণ তার বাড়িটি আমার চেয়ে বড়, তার চারটে শোবার ঘর আর আমার মাত্র তিনটে), তবে নিজের অন্তরের সুরক্ষার স্বার্থেই সাময়িকভাবে হলেও সেই সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ, প্রথম কাজ হলো নিজের সমস্যা এবং তা সৃষ্টির মূল কারণটিকে চিহ্নিত করার জন্য সঠিক দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা।

মুজাহাদাহ

ত্রুটি চিহ্নিত করার পরের ধাপটিকে বলা হয় ‘মুজাহাদাহ’, যার অর্থ অন্তরের কুপ্রবৃত্তির সাথে কঠোর সংগ্রাম। এটিই হলো মানবজীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। আত্মশুদ্ধির এই বিশেষ প্রক্রিয়াটিতে মূলত চারটি জিনিস কমাতে হয় এবং একটি জিনিস বাড়াতে হয়।

কমানোর মতো চারটি বর্জনীয় উপাদান:

১. স্বল্পভাষণ: অনর্থক ও অতিরিক্ত কথা বলা কমিয়ে আনা।

২. স্বল্প নিদ্রা: অলসতা দূর করতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত না ঘুমানো।

৩. স্বল্প আহার: প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে পরিমিত আহার গ্রহণ করা।

৪. সীমিত সামাজিকতা: মানুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা বা অহেতুক আড্ডা কমিয়ে দেওয়া।

বাড়ানোর মতো একটি অপরিহার্য উপাদান:

আল্লাহ তাআলার জিকির: যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি বাড়াতে হবে, তা হলো আল্লাহ তাআলার জিকির বা সার্বক্ষণিক স্মরণ। এই জিকিরই হলো অন্তরের পরিশুদ্ধির মূল ভিত্তি এবং ময়লা পরিষ্কার করার সবচেয়ে বড় উপাদান। সেই কাঁচের সুদৃশ্য পাত্রটি ধোয়ার প্রধান মাধ্যমই হলো এই জিকির। এই জিকির হতে পারে যে কোনো উপায়েÍকোরআন তেলাওয়াত করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা বা ইস্তিগফার প্রার্থনা করা, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন আজকার পাঠ করা কিংবা আল্লাহর সৃষ্টিজগতের অনুপম সৌন্দর্য দেখে মনে মনে তাঁর মহত্ব নিয়ে ফিকির বা চিন্তা করা।

পরিশুদ্ধ অন্তরের মহিমান্বিত ফল

অন্তরের এই পরিচ্ছন্নতার প্রক্রিয়াটি কোনো একদিন বা দুদিনের সাময়িক কোনো বিষয় নয়, এটি জীবনভর চালিয়ে যাওয়ার মতো একটি নিরবচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক সাধনা। এর ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মাঝে এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করে। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, সৌম্য ও স্থির হয়ে ওঠে এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের প্রতি তার কৃতজ্ঞতাবোধ অনেক বৃদ্ধি পায়।

আমাদের বর্তমান যান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি হলো সারাক্ষণ অভাব-অভিযোগ ও অপূর্ণতার হাহাকার করা; অন্তরের পরিশুদ্ধি ঘটলে মানুষের এই ক্ষতিকর প্রবণতা ক্রমশ কমে আসে। জাগতিক বা বস্তুগত জিনিসের প্রতি মোহ দূর হয়ে এক পরম তৃপ্ত আত্মিক অবস্থা বা ‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ তৈরি হয়।

মানুষ যখন আল্লাহর যত কাছাকাছি পৌঁছায়, গভীর রাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত করার সময় তখন তার চোখ দিয়ে ভক্তির অশ্রু ঝরে। আজ আমাদের যান্ত্রিক সমাজে ঠিক এই জিনিসটিরই সবচেয়ে বেশি অভাব। মানুষ আজ প্রতিনিয়ত নিজের চারপাশে নানাবিধ আত্মিক ভাইরাসের মধ্যে বসবাস করছে; আর তাই এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা থেকে বাঁচতে অন্তরের স্ফটিক পাত্রটিকে আবার আল্লাহর স্মরণের আলোয় ধুয়েমুছে সাফ করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।