ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনীর উদ্ধার-ত্রাণ কার্যক্রম

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:১৪ এএম

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলকাায় আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীও উদ্ধার কার্যক্রমে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা, সীমান্তরক্ষা বাহিনী এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সম্মিলিতিভাবে পাহাড়ধস এবং বন্যার পানিতে আটকেপড়া পরিবারগুলোকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা এবং ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর জানিয়েছে, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা ও শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেল, আলুসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার, ত্রাণ সহায়তা, নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

আইএসপিআর জানিয়েছে, দুর্যোগের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ফলে সড়ক যোগাযোগ বিঘিœত হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাটি ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করে যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃস্থাপনে কাজ করছেন। একই সঙ্গে ভূমিধসের উচ্চঝুঁকিতে থাকা এলাকা থেকে প্রায় ২২১টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে উদ্ধারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ পর্যন্ত বান্দরবান থেকে ১৪০ জন এবং সাজেকে আটকেপড়া প্রায় ৬০০ পর্যটকের মধ্যে প্রথম ধাপে ১৫০ জনকে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট পর্যটকদের পর্যায়ক্রমে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেল, আলুসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্ধার, ত্রাণ সহায়তা, যোগাযোগ পুনঃস্থাপন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের যেকোনো দুর্যোগ ও জাতীয় সংকটে জনগণের জীবন, সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

বান্দরবানে বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে বিজিবি : এদিকে বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিগত কয়েকদিনের টানা অতিবৃষ্টির ফলে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বান্দরবান জেলা শহরের সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলার বিশেষ করে রোয়াংছড়ি উপজেলার যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে এবং ধ্বংসাবশেষ জমে মূল সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে জনসাধারণ চরম দুর্ভোগে পড়ে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বিজিবির বান্দরবান সেক্টর সদর দপ্তরের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। বিজিবি সদস্যরা নিরলস প্রচেষ্টায় সড়কে উপড়ে পড়া গাছ ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করে বান্দরবানের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করেন। যার ফলে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। শুধু সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারেই নয়, গাছ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি মেরামতের কাজেও বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত সহায়তা প্রদান করছেন। দ্রুত বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থা সচল করার লক্ষ্যে এই যৌথ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির তাৎক্ষণিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বিজিবি সদস্যদের দায়িত্বশীল পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে এবং জনদুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব হয়েছে।

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর ভাঙনে প্লাবিত ৩৩ গ্রাম, দুর্গতদের পাশে আনসার-ভিডিপি : আনসার-ভিডিপি সদর দপ্তর জানিয়েছে, ৯ জুলাই  রাতের আঁধারে কয়েকদিনের ভারি বর্ষণের সঙ্গে ধেয়ে আসা খোয়াই নদীর তীব্র স্রোতে ভেঙে যায় সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের প্রধান প্রতিরক্ষা বাঁধ। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় আনসার-ভিডিপি সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও পানির তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধ মেরামত করা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার সকাল হতেই বিস্তীর্ণ জনপদ রূপ নেয় এক বিশাল জলরাশিতে। আকস্মিক এই বন্যায় প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৩৩টি গ্রাম, ঘরবাড়িতে কোমর থেকে বুকসমান পানিতে বিপাকে হাজারো মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বসতভিটা। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। চারদিকের এই আর্তনাদের মাঝেই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভিডিপি সদস্যরা। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোমর ও বুকসমান পানিতে নেমে তারা একে একে উদ্ধার করছেন আটকেপড়া অসহায় মানুষদের। বিভিন্ন উপায়ে পরম মমতায় তাদের পৌঁছে দিচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে (ফ্লাড শেল্টার সেন্টার)। ভিডিপি সদস্যরা কেবল মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিচ্ছেন না, বরং বন্যাকবলিতদের গৃহপালিত পশুপাখিও উদ্ধার করে আনছেন। শুধু উদ্ধার অভিযানই নয়, মানবিক সহায়তায় দিন-রাত কাজ করছেন এই বাহিনীর সদস্যরা। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সর্বোচ্চ নির্দেশনা রয়েছে বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ দেশের সব বন্যাকবলিত এলাকায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের সাধ্যমতো সর্বাত্মকভাবে মানুষের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। আনসার ও ভিডিপি জেলা কমান্ড্যান্ট ও উপজেলা কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থেকে এই উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।

যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ কিংবা সংকটে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সবসময়ই সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। হবিগঞ্জের এই ভয়াবহ বন্যাতেও তারা দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। নিজেরা না খেয়ে, না ঘুমিয়ে অন্যের জীবন বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার এই গল্প আরও একবার মনে করিয়ে দেয়Ñ দুর্যোগে-দুর্বিপাকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সত্যিই বাংলার মানুষের পরম বন্ধু।