চুরির মামলায় গ্রেপ্তার আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের মারধর এবং থানা ভাঙচুরের ঘটনায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে পুলিশ। আগৈলঝাড়া থানার পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ৩০০ জনকে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে আসামি মৃত্যুর ঘটনায় মব তৈরি করে থানায় হামলা, ভাঙচুর এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনায় চরম উদ্বেগ ছড়িয়েছে। পরিস্থিতিকে অশনিসংকেত বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনায় জড়িতরা যে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকই হোক না কেন, দ্রুত গ্রেপ্তার করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে আগ্রহ হারাবে।
গত ৮ জুলাই আগৈলঝাড়া থানার ফিলিং স্টেশন রোড থেকে মো. রিয়াজ ফকির নামে ২৬ বছর বয়সি এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই আসামির বিরুদ্ধে চুরির মামলা ছাড়াও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা ছিল। গ্রেপ্তারের পর তাকে থানার জেলে রাখা হয়। আসামি রিয়াজ জেলে থাকা অবস্থায় নিজেই নিজের মাথা দেয়ালে ঠুকে ফাটিয়ে ফেলে। পুলিশ হেফাজতে আহত হওয়ার ঘটনায় তাকে উদ্ধারে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলেও জ্ঞান ফিরেনি। এদিকে তার মৃত্যু হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে আসামির আত্মীয়স্বজনের নেতৃত্বে একদল এলাকাবাসী আগৈলঝাড়া থানায় ৯ জুলাই বিকেলে হামলা করে। থানার ভেতরে থাকা পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক মারধরের পাশাপাশি থানায় ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। ঘটনায় পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হন। থানায় হামলা এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় নেতৃত্বে থাকা আসামি রিয়াজের বাবা সিদ্দিক ফকিরসহ ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। থানা থেকে লুট হওয়া ল্যাপটপ ও রেজিস্টারসমূহ উদ্ধারে পুলিশি কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, থানায় হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারপিটের ঘটনায় ৪৩ জনকে শনাক্ত করা গেছে। অজ্ঞাতনামা আরও যেসব ব্যক্তি রয়েছেন, তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। থানায় ভাঙচুর এবং পুলিশ সদস্যদের মারপিট বড় ধরনের অপরাধ। এ অপরাধে জড়িতদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, থানায় হামলার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেনÑ মো. ইদ্রিস ফকির, শফিকুল ফকির, সিদ্দিক ফকির, কাঞ্চন ফকির, কাশেম ফকির, রানা সরদার, নয়ন সরদার, সজল ফকির, মৃণাল ফকির, কালু ফকির, নিজাম ফকির, হালিম ফকির, মান্নান ফকির, রিফাত ফকির, নাইম ফকির, রাসু হাওলাদার, মো. সবুজ ফকির, হাবিবুর রহমান, গিয়াস উদ্দিন ফকির, রিপন ফকির, নাজমুল, রাসেল পাইক। এ ছাড়া সাইফুল ইসলাম মোল্লা, সাগর সেরনিয়াবাত, আজাদ সেরনিয়াবাদ, ফারুক ফকির, আকাশ, শারমিন আক্তার, তানজিলা বেগম, রাব্বি ফকির, কামাল ফকির, সুজন ফকির, ফেরদৌস ফকির, নাছিমা রেখা বেগম, মমতাজ বেগম, মনোয়ারা বেগম, ইয়াসমিন বেগম, ময়না বেগম, আসমা বেগম, নাজমা আক্তার, কুমুর আক্তার, শারমিন আক্তার, মোসা. তাহমিনা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার দিন গ্রেপ্তার আসামি রিয়াজ ফকিরের বাবা ইদ্রিস ফকির তার ছেলের মৃত্যুর গুজব ছড়ান। সেই গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ফকিরবাড়ির ইদ্রিস ফকিরের নেতৃত্বে নারী-পুরুষ লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে দলবদ্ধভাবে আগৈলঝাড়া থানার মূল ফটক ভেঙে ডিউটি অফিসারের কক্ষে ঢুকে কর্তব্যরত এএসআই মো. আব্দুল হালিমকে হত্যার উদ্দেশ্যে টেনেহিঁচড়ে বের করে বেধড়ক মারধর করেন। আসামির আত্মীয় কাঞ্চন ফকির ইট দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে এএসআই মোহাম্মদ আব্দুল হালিমের মাথায় আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করেন। থানায় উপস্থিত সব অফিসার ও ফোর্স এগিয়ে এলে অভিযুক্তদের ইট-পাটকেল নিক্ষেপে এসআই ওমর ফারুক, কনস্টেবল আতিকুর রহমান, মো. ফরহাদ, মো. লিমন আহত হন। একপর্যায় অভিযুক্তরা থানার ডিউটি অফিসারের রুমে ঢুকে সমস্ত চেয়ার ভাঙচুর করেন এবং বিভিন্ন রেজিস্টারপত্র ছিঁড়ে নষ্ট করে এবং এএসআই মোহাম্মদ আব্দুল হালিমের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত একটি ল্যাপটপ নিয়ে যান। পরে থানায় উপস্থিত সব অফিসার, ফোর্স ও স্থানীয় সুশীল সমাজের লোকজন অভিযুক্তদের ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে চলে যান। এ ঘটনায় গুরুতর আহত এএসআই মোহাম্মদ আব্দুল হালিম বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য পুলিশ সদস্যরা আগৈলঝাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে থানায় অবস্থান করছেন।

