দেশের বৃহত্তম সাফারি পার্ক হিসেবে একসময় দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ ছিল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ইন্দ্রপুরে অবস্থিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক’। ২০১৩ সালে জমকালো আয়োজনে যাত্রা শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা বাঘ, সিংহ, হাতি, জিরাফ, জেব্রাসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় করতেন। কিন্তু এক যুগের ব্যবধানে পার্কটি এখন প্রাণী পরিচর্যায় অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের চরম দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার নানা অসংগতি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি পার্কের একটি হাতি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে জনমনে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, হাতিটির সামনের দুই পা প্রায় অচল হয়ে গেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেটি মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পার্কের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য সংবাদকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হন।
পার্কের ১ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিকরা। এ সময় পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তারেক রহমান জানান, হাতিটি অসুস্থ এবং চিকিৎসা চলছে। তবে হাতিটি যে এলাকায় রয়েছে, সেটি ‘রেস্ট্রিকটেড এরিয়া’ বা সংরক্ষিত এলাকাÑ এই অজুহাত দেখিয়ে সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে দেখে সঠিক তথ্য তুলে ধরার স্বার্থে সাংবাদিকরা একাধিকবার হাতিটিকে দেখার অনুমতি চাইলেও কর্তৃপক্ষ অনড় ছিল। এতে অসুস্থ হাতিটির প্রকৃত শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
হাতির কাছে যাওয়ার অনুমতি না পেলেও সংবাদকর্মীরা পার্কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনের সময় পার্কের নাজুক চিত্র ফুটে ওঠে। পার্কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। ঝোপঝাড় পরিষ্কার বা পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।
পরিদর্শনের সময় আরও একটি দায়িত্বহীনতার চিত্র প্রকাশ্যে আসে। দিনের বেলাতেও পার্কের ভেতরে একটি বাঁশের খুঁটিতে স্থাপিত এলইডি বাতি জ্বলতে দেখা যায়। যখন দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দিনের বেলায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখার ঘটনা সরকারি সম্পদের অপচয় এবং তদারকির চরম ঘাটতিকেই প্রমাণ করে। দীর্ঘ সময় ধরে বাতিটি জ্বললেও সেটি বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ পার্কের দায়িত্বরত কারো মধ্যে দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পার্কে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা পর্যাপ্ত। সরকারি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা সত্ত্বেও প্রাণী পরিচর্যা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে তাদের মধ্যে কাক্সিক্ষত দায়িত্বশীলতার বড় অভাব রয়েছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় এই সাফারি পার্কটির পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার মান ক্রমাগত নি¤œমুখী হচ্ছে।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পার্কে বাঘ, জেব্রা ও সিংহের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এসব ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন বা দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। ফলে পার্কের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রশ্নগুলো আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বন্য প্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাফারি পার্ক কেবল একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্র। এখানে থাকা প্রতিটি প্রাণী রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তাই প্রাণীদের চিকিৎসা, খাদ্য, পরিচর্যা ও আবাসস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। গণমাধ্যমকে তথ্য সংগ্রহে বাধা না দিয়ে সহযোগিতা করলে জনমনের বিভ্রান্তি দূর করা সহজ হতো।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রকৃতিপ্রেমী ও সচেতন মহলের দাবি, গাজীপুর সাফারি পার্কের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি, প্রাণীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশের বৃহত্তম এই সাফারি পার্ককে আবারও তার স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তারেক রহমান বলেন, ‘একটি হাতি আরেকটি হাতিকে আঘাত করার পর এটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাতিটির সামনের দুই পায়ে সমস্যা হয়েছে, যে কারণে সেটি উঠে দাঁড়াতে পারছে না। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে এবং নতুন করে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে।’ তবে পার্কের ভেতরে পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা এবং দিনের বেলায় এলইডি বাতি জ্বলতে থাকার বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট মন্তব্য করেননি।

