বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে গ্রুপ অব ৩২-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আজ রাতে জাপানের মুখোমুখি হচ্ছে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। র্যাঙ্কিং, ইতিহাস ও স্কোয়াড শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও জাপানের সাম্প্রতিক ফর্ম ও কৌশল ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নিচে জাপানের কাছে ব্রাজিলের পরাজয়ের বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হল।
হাই-প্রেসিং ও মাঝমাঠে আধিপত্য : জাপানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের হাই-প্রেসিং ফুটবল। মাঠের প্রতিটি অংশে তারা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে এবং দ্রুত বল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। উইং-ব্যাকদের কার্যকর ব্যবহার ও মাঝমাঠের আগ্রাসী প্রেসিংয়ের কারণে ব্রাজিলের স্বাভাবিক বিল্ড-আপ ব্যাহত হতে পারে। কম পজিশনেও ম্যাচ জেতার সক্ষমতা আগেও প্রমাণ করেছে জাপান।
বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাক : কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর অধীনে জাপানের মূল শক্তি হলো তাদের অবিশ্বাস্য ম্যাচ-লং স্ট্যামিনা এবং কাউন্টার-অ্যাটাকিং গতি। তারা নিজেদের ডিফেন্সিভ ব্লকে পজিশন ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে দেয় এবং বল পায়ে আসার মুহূর্তের মধ্যেই কাউন্টার-অ্যাটাক করে। কাতার বিশ্বকাপ থেকে এই কৌশল আরও উন্নত করেছে জাপান। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে সামান্য ফাঁকা জায়গা পেলেই সেটিকে তারা গোলের সুযোগে পরিণত করতে পারে, যা ব্রাজিলের জন্য বড় হুমকি।
ব্রাজিলের অ্যাটাকিং ফুল-ব্যাকরা (যেমন দানিলো বা দগলাস সান্তোস) যখন আক্রমণের জন্য ওপরে উঠে আসেন, তখন তাদের পেছনে বিশাল খালি জায়গা তৈরি হয়। জাপান বল উইন করার পর মাত্র ৩০% পজেশন নিয়েও কাউন্টার-অ্যাটাকে ম্যাচ জেতার ক্ষমতা রাখে, যা তারা ইংল্যান্ড ও খোদ ব্রাজিলের বিরুদ্ধে করে দেখিয়েছে। জাপানের রিতসু দোয়ান এবং কেইতো নাকামুরার মতো উইঙ্গাররা এই খালি জায়গা ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণে উঠতে পারেন।
রক্ষণে ‘লো-ব্লক’ ও হাফ স্পেস বন্ধ : ব্রাজিলের প্রধান শক্তি ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং লুকাস পাকেতার মতো তারকাদের ড্রিবলিং ও ক্রিয়েটিভিটি। কিন্তু জাপান তাদের রক্ষণভাগে একটি জমাট ‘লো-ব্লক’ তৈরি করে খেলে। মিডফিল্ডার কাইশু সানো এবং আও তানাকা বক্সের সামনের হাফ-স্পেস ও পাসিং লেনগুলো এমনভাবে বন্ধ করে রাখেন যে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডদের জন্য বক্সে ঢোকা বা শট নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
৩-৪-২-১ ফরমেশনের ‘ট্যাকটিক্যাল ট্র্যাপ’ : জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসু সাধারণত ৩-৪-২-১ ফরমেশন ব্যবহার করেন। ব্রাজিলের ৪-২-৩-১ বা আক্রমণাত্মক ডায়মন্ড ফরমেশনের বিরুদ্ধে এটি ডিফেন্সে একটি বিশাল সুবিধা তৈরি করে। ব্রাজিলের দুই স্ট্রাইকারের বিপরীতে জাপানের তিনজন সেন্টার-ব্যাক থাকায় তারা সহজেই সুবিধা পায়। ব্রাজিল হাই-প্রেস করতে গেলে তাদের মিডফিল্ড ফাঁকা হয়ে যায়, যা জাপান সহজেই কাজে লাগাতে পারে।
একক তারকা নির্ভর না হওয়া ও মানসিক দৃঢ়তা : ব্রাজিলের আক্রমণভাগ অনেকটাই ভিনিসিয়ুসের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, ইনজুরির কারণে তাকেফুসা কুবো বা কাওরু মিতোমার মতো বড় তারকারা না থাকলেও জাপানের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তাদের মূল শক্তি দলগত বোঝাপড়া এবং ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা। প্রত্যেকে ডিফেন্স ও অ্যাটাকে সমান পরিশ্রম করায় প্রতিপক্ষের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড়কে মার্ক করে জাপানের আক্রমণ থামানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া জাপানের স্কোয়াডের অনেকেই ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ও বুন্দেসলিগার অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক ও ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাকেফুসা কুবো, তাকুমি মিনামিনো ও রিতসু দোয়ানের মতো খেলোয়াড়রা সেখানকার খেলার কৌশলে অভ্যস্ত।
ফলে বলতেই হয়, জাপান এখন আর কোনোভাবেই আন্ডারডগ নয়। বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তারা কোনো একক তারকার ওপর নির্ভর করে না। পুরো দল মিলেই আক্রমণ ও রক্ষণ সামলায়, যা ব্রাজিলের জন্য ম্যাচ পরিকল্পনা কঠিন করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইতিহাস ও শক্তির বিচারে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও জাপানের কৌশল, দ্রুতগতির এবং দলগত ফুটবল আজকের ম্যাচে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন