হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে তেহরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে গত কয়েক দিন ইরানে ব্যাপক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। হামলার পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী চার দেশ কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় হামলা করে ইরান। ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ বাহিদি। অন্যদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যে দাবি করা হয়েছে, ইরান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য নতুন পরিকল্পনা করেছিল। এমনিতেই পাল্টাপাল্টি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধবিরতি যখন ভেঙে পড়ার শঙ্কায়, তখন এমন গোয়েন্দা দাবি নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টির প্রেক্ষাপাটে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে আশার কথা, পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা : হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলার প্রতিশোধে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা বৃহস্পতিবার ইরানের মোট ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশপাশের কিছু এলাকাও ছিল। আগের দিন বুধবার ৮০টি টার্গেটে হামলার কথা জানানো হয়েছিল।
ইরানের দাবি, গত দুই দিনে এসব হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানো হয়েছে। প্রদেশটির উপ-গভর্নরের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়। তবে সবশেষ এসব হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি। এসব হামলার জবাবে কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন সম্পদের ওপর হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এবারের হামলায় কুয়েতের মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কাতারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাবিষয়ক পূর্ব সতর্কীকারণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি জ¦ালানি ডিপোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এদিকে পাল্টপাল্টি হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকেরা।
খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ বাহিদি দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
সংবাদ সংস্থা সেপাহ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাহিদি বলেন, ন্যায়বিচারের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে শিশু হত্যাকারী মার্কিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তিনি আরও বলেন, আমেরিকার অপরাধী নেতারা এবং ইসলামি বিপ্লব ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের সব শত্রুকে জানতে হবে, এই নেতাকে কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করে তারা কখনোই প্রতিরোধের পতাকা মাটিতে নামিয়ে আনতে পারবে না।
বাহিদি বলেন, শহিদদের রক্তের প্রতিশোধ এবং এই হত্যাকা-ের দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা একটি চূড়ান্ত, বৈধ এবং অবিস্মরণীয় দাবি হয়ে থাকবে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যে ট্রাম্প হত্যার পরিকল্পনা : এদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনায় নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সিএনএন জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি যখন ভেঙে পড়ার শঙ্কায়, তখন এমন গোয়েন্দা দাবি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করল।
ইসরায়েলি দুটি সূত্র দাবি করেছে, এমন তথ্য চলতি সপ্তাহে এসেছে। অন্য একটি সূত্র বলেছে, ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রমাগত গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিল। তবে ইসরায়েলের কাছ থেকে আসা এই দাবি ছিল নতুন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া বহু ইরানি ট্রাম্পের মৃত্যুর দাবিতে স্লোগান দিয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই তিনি এ মন্তব্য করেন। নেতানিয়াহু বলেন, সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। সামনে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান হতে পারে। সবাই প্রস্তুত থাকুন।
যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টায় ৫ দেশ : মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টায় গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের কর্মকর্তারা ।
মধ্যস্থতার সঙ্গে জড়িত একটি আঞ্চলিক সূত্র এক্সিওসকে জানিয়েছে, প্রথম লক্ষ্য হলো দুই পক্ষকে উত্তেজনা কমাতে রাজি করানো। এরপর পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের নতুন বৈঠকের তারিখ ঠিক করা।
মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একজন কর্মকর্তা এক্সিওসকে জানান, তাদের ধারণা হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইরানের এমন কিছু কট্টরপন্থি গোষ্ঠী করেছে, যারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকটির বিরোধী এবং একে দুর্বল করতে চায়। এক্সিওসের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগে পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছিল। তাই তারা চাইছেন সেই আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ুক।
চলমান উত্তেজনা কমাতে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনও। গতকাল মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তেজনা আরও না বাড়াতে কৌশলগতভাবে সীমিত হামলা চালিয়ে বিরতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজন হলে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনে নতুন করে মার্কিন হামলা চালানোর প্রস্তুতিও রাখা হয়েছিল। তবে আপাতত সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

